১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২১শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি



তরুণ প্রজন্মের ইতিবাচক চিন্তার প্রয়োজনীয়তা

শাকিবুল হাসান
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

সমাজ পরিবর্তনশীলন। দশ বছর আগের সমাজ আর আজকের সমাজের মধ্যে মিলটা খুব কমই। ঠিক তেমনই আগামী দশ বছরে পরিবর্তিত সমাজ আর বর্তমান সমাজের মধ্যে খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। উন্নতির ধারাবাহিকতায় আগের চেয়ে আরও উন্নত হবে এটা বলাই যায়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সমাজ উন্নতির শিখরে আরোহন করছে। এর পিছনে রয়েছে তথ্য প্রযুক্তির এক সুবিশাল অবদান। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের জীবন সহজ থেকে আরও সহজতর হয়ে উঠেছে। এবং ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার জন্য আরও সহজ ও সমৃদ্ধ হবে এমনটাই সবার প্রত্যাশা। যুগে যুগে তরুণ ও যুবক শ্রেণি সমাজ পরিবর্তনে অনস্বীকার্য ভূমিকা রেখেছে এবং তার ধারাবাহিকতা চলমান।

পৃথিবীতে এক শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত চিন্তা–ভাবনা, গবেষণা করে যাচ্ছে কিভাবে পৃথিবীকে আরও সহজ করে মানুষের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায়। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা যতটা আধুনিক হচ্ছি, ঠিক তেমনই আমাদের মধ্যে  থেকে মানবিকতা বোধ দিন দিন লোপ পাচ্ছে। ইতিবাচক মনোভাবেরর সংকট দেখা দিচ্ছে। আমরা নিজ স্বার্থের দাসত্ব গ্রহণ করে বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছি। আধুনিক সমাজের সর্বত্র দূর্নীতি, গুম, খুন, হানাহানি, দেশে দেশে যুদ্ধ-বিগ্রহসহ অসহায় মানুষের আহাজারি বেড়েই চলেছে। কিন্তু আমরা প্রযুক্তির কাছে দাসত্ব স্বীকার করে বাস্তব জগতকে প্রাধান্য মনোভাব থেকে অনেক দূরে চলে গেছি। প্রযুক্তির করাল গ্রাসে আমরা অন্ধ হয়ে গেছি। তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় চিন্তা–ভাবনা ব্যস্ত। প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় কার্যকলাপে তারা অধিক আগ্রহী। অথচ এই সমাজ তাদের থেকে কতকিছু আশা করে, সমাজে তরুণশক্তির অনেককিছু দেওয়ার আছে। কিন্তু আমরা বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে প্রযুক্তির মোহে হিতাহিত জ্ঞানকে বিসর্জন দিচ্ছি। গত কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জুস কারখানায় আগুন লেগে ৫২ জন মানুষের প্রানহানি ঘটে। এই ঘটনায় প্রশাসনের তদারকি এবং কারখানা কতৃপক্ষের গাফিলতি একদম স্পষ্ট। এ ঘটনায় গোটা দেশের মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়। এতে করে টেলিভিশন, পত্র–পত্রিকাসহ  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিচার, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দাবিসহ সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর একদিন কি দুদিন পরে কোপা আমেরিকা ও ইউরো ফুটবল খেলা নিয়ে তরুণদের মাঝে উন্মাদনার ঢেউ শুরু হয়।

আগেরদিন ঘঠে যাওয়া লৌহমর্ষক ঘটনাকে বেমালুম ভুলে গিয়ে ফুটবল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ শুরু হয়। শুধু তাই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আর্জেনটিনা–ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে মারামারি, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে অনেকে আহত হয়। এ যেন স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া। অথচ সমাজে এর চেয়েও কত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে যাতে তরুণ সমাজের ইতিবাচক চিন্তা–ভাবনা জরুরি। বর্তমানে দেশে মহামারী ঠেকাতে সরকার চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না। কিন্তু তরুণ সমাজ যতসব অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে চর্চায় মগ্ন। আমরা ইস্যুময় হয়ে গেছি। নতুন ইস্যু পেলেই প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব বিবেচনা না করেই সেটা ভুলে গিয়ে নতুন ইস্যু নিয়ে মাখামাখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এই তরুণ সমাজের উচিৎ ছিল মহামারীর সময়ে সমাজকে কিভাবে সার্বিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করা যায় সেই চিন্তা করা। কিন্তু আমরা বরাবরই উল্টো পথে হাটঁছি। তরুণ সমাজের বড় একটা অংশ ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, পাবজি, ফ্রী–ফায়ারের আত্মঘাতী গেমস খেলতে ব্যস্ত। যে কারণে আমাদের নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয়ে বেড়ে উঠছে। তারা বাস্তব চিন্তা জগত থেকে অনেকটাই দূরে। যার ফলে পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক কলহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।  সেই সাথে ইতিবাচক মনোভাব, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতার মনোভাব, সহমর্মিতা ইত্যাদি হ্রাস পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, অল্পতে সেলিব্রেটি হওয়ার লোভে দেশের অসংখ্য তরুণ, তরুণী এসব সামাজিক প্লাটফর্মে দারুণভাবে আসক্ত। মজার নামে অশালীন ভিডিও বা কাউকে বেকায়দায় ফেলে সেটার ভিডিও ধারণ করে এসব অ্যাপে আপলোড করা হয়৷ যাতে মুহূর্তের মধ্যেই হাজার মানুষের লাইক, কমেন্টস আসে। এরাই একসময় বিদেশে নারী পাচার, কিশোর গ্যাং, মাদকদ্রব্য আমদানিসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ে। অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে আপলোডের অপরাধে সম্প্রতি রাজশাহীতে বেশ কয়েকজন তরুণ–তরুণীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পারিবারিক দিক থেকে সচেতন না হলে প্রশাসনের পক্ষে এদের দৌরাত্ম্য কমানো প্রায় অসম্ভব। তাই প্রশাসনের তৎপরতার পাশাপাশি পরিবারের অবিভাবকদেরও যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। অতি আধুনিক হতে গিয়ে আমরা নিজেদের সংস্কৃতিকে ভুলে বিদেশি অপসংস্কৃতির মোহে পড়েছি। চারদিকে অপসংস্কৃতির দৌরাত্ম্য, ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের আগ্রাসন। প্রযুক্তির উন্নতি একদিকে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। ঠিক তেমনই মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরশীলতার জন্য মানুষের মনুষ্যত্ব লোপ পাচ্ছে। রাস্তা–ঘাটে কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করার পরিবর্তে মোবাইল ফোণে ভিডিও ধারণ করে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ  প্রচার করা হচ্ছে। শুধুমাত্র নিজের পরিচিতি বাড়ানোর জন্য। এটি সামাজিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ের একটি নিদর্শন।

সমাজের ইতিবাচক চিন্তার বিস্তারে নাটক, সিনেমা  ও গানের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি সিনেমা, নাটক, ওয়েব সিরিজ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের অন্তরায়। যেগুলো অশ্লীলতা, যৌনতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অপসংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ। দুঃখজনক ব্যাপার হলো বর্তমান সমাজের অধিকাংশ মানুষই এসবে চরম পর্যায়ের আসক্ত। এদের ভীড়ে অতীতের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। গানের বেলায়ও একই অবস্থা। আমাদের দেশের কবি, শিল্পী, বাউলরা, ভাটিয়ালি,  জারি, সারি, মুর্শিদি, লোকগীতি, পল্লীগীতিসহ  কতরকম গান রচনা ও সুর করে গেছেন। যেগুলোর প্রতিটি লাইনের সাথে জড়িয়ে আছে গ্রাম বাংলার মাটির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। কিন্তু সেগুলোকে তুচ্ছ করে বর্তমান প্রজন্ম প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ এবং রোমান্টিকতায় ভরপুর গানের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে সমাজে গুম, হত্যা, ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর কিছুদিন পর হয়তো ভুলেই যাব যে  বাঙালির নিজস্ব একটি সংস্কৃতি আছে। সমাজের এমন চরম অবনতি আটকাতে হলে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইতিবাচক চিন্তা–ভাবনার প্রসার ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমাজের যুবকদের এগিয়ে আসতে হবে।

সমাজবিধ্বংসীকারী এসব সামাজিক প্লাটফর্ম বর্জন করতে হবে। সেই সাথে সবার মাঝে নিজ সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। অতিনির্ভরশীলতার ফলে প্রযুক্তির ওপর থেকে মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তে প্রযুক্তি–ই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আগে যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে এবং দাবি আদায়ের জন্য মানুষ রাস্তায় আন্দোলন করতো। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহারের কুফলে মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই নিজেদের দুনিয়া মনে করছে। নিজেদের আবেগ, দুঃখ, প্রতিবাদ সবকিছু ফেসবুকে প্রকাশ করছে। ফলে অন্যায়, অবিচারের মাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। অশ্লীলতা, অপসংস্কৃতি ইত্যাদি সব নেতিবাচক মনোভাব পরিহার করতে হবে। সেই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।


লেখক: শাকিবুল হাসান
শিক্ষার্থী: বরেন্দ্র কলেজ রাজশাহী
সদস্য: বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম


কুশিয়ারাভিউ২৪ডটকম/১৮ জুলাই,২০২১/শাকিবুল






এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ





















© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
themesbazar_brekingnews1*5k