১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১৯শে সফর, ১৪৪৩ হিজরি



দেশ ত্যাগে তরুণ প্রজন্ম অধিক আগ্রহী কেন

রিপোটারের নাম
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১

ষাটের দশকের শেষভাগে ভারতের সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পৃথিবীর যে দেশেই যেতেন সেখানে তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের দেশে ফেরার জন্য আহ্বান জানাতেন। তিনি তাদের দেশে ফিরে এসে নিজের দেশের অর্থনীতিতে, শিক্ষায় অবদান রাখার জন্য বলতেন। ইন্দিরা গান্ধীর আহ্বানে অনেকেই ফিরে এসেছিলেন। এবং তাদের অনেকেই রাজীব গান্ধীর আমলে প্রযুক্তিনির্ভর ভারত গড়তে সাহায্য করে।  বাংলাদেশে এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি ধারাবাহিকতা চলছে। কিন্তু একটি বিষয় খুব নিবিড়ভাবে দেখলে দেখা যায়, এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যেও তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি বিদেশমুখী। সবাই প্রতি মুহূর্তে বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছে। আর উচ্চশিক্ষার জন্য যারা যাচ্ছে, তাদেরও বড় একটি অংশ দেশে ফিরতে চায় না বা ফিরছে না। অন্যদিকে একটু সামর্থ আছে বা যেকোনো বৃত্তি নিয়ে এমনকি বিদেশে যেকোনো ধরনের কাজের সুযোগ পেলে বিদেশে পড়াশুনা করতে চলে যাচ্ছে অনেক ভালো শিক্ষার্থী। এবং তাদের বড় একটি অংশ দেশে ফিরতে চায় না।

বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তির জগতে তারা সহজে সারা বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারছে। সেখানে তারা দেখতে পাচ্ছে, বিদেশে যেসব বিষয় পড়াশুনা করানো হয়, সেগুলো সবই বাস্তবভিত্তিক। বাস্তব জীবনে কাজে লাগে, সেখান থেকে সে অনেক কিছু শিখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হয়, তার বেশিভাগ তাদের বাস্তব জীবনে কাজে আসে না। এবং বাস্তবে ওই শিক্ষার ওপর নির্ভর করে সে কোনো ভালো কাজ পাবে না। যেহেতু বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি বাস্তবভিত্তিক- তাই তারা স্বাভাবিকই যেকোনো প্রকারে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ খোঁজে, বিদেশে পড়াশুনার সুযোগ খোঁজে।

অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার জন্য যারা যাচ্ছে, তাদের বেশিভাগই বলে থাকেন দেশে রিসার্চের সুযোগ খুবই কম। বিদেশে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক রিসার্চ করার সুযোগ আছে। তাছাড়া, বাংলাদেশে রিসার্চের মানও দিন দিন প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রিসার্চ অন্যের রিসার্চ থেকে চুরি বলে প্রমাণিত হয়েছে। এবং তারপরেও তারা কোনো কঠোর শাস্তি পাননি। এ ধরনের ঘটনা হয়তো এই প্রথম সামনে এসেছে। তবে দেশের শিক্ষাঙ্গনের এই তরুণরা এগুলো জানে দীর্ঘদিন ধরে। তাই তাদের দেশের গবেষণা বা পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে হতাশা অনেক বেশি। এ কারণে একটি বড় অংশ বিদেশে পাড়ি জমায়। আবার এর পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি মনোযোগের বিষয়টিও সামনে এনেছেন অনেক ছাত্রছাত্রী। অনেক সময় বলতে শোনা যায়, শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়ান না। এবং যতটুকু পড়ান তা তাদের খুব কাজে আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি বড় অংশের প্রতি তাদের অভিযোগ, ওই সব শিক্ষক সারাক্ষণ রাজনীতি নিয়ে থাকেন। তারা মোটেই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার দিকে কোনো মনোযোগ দেন না। তবে এরপরও বাংলাদেশে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী প্রতিবছর পড়াশুনা করছে। পাস করে বের হচ্ছে। তারা দেশে কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে বা চাকরির সঙ্গে জড়িত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে তারা বিদেশে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছে। এখানে দেখা যাচ্ছে, বুয়েট থেকে যারা পাস করছে, তারা বিদেশে গেলে অনেক ভালো চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। দেশের থেকে বেতন অনেক বেশি। তা ছাড়া, নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে ভদ্রভাবে কাজ করতে পারছে। সে কারণে বুয়েট থেকে পড়া ছাত্রছাত্রী ও বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা সব সময়ই বিদেশে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছে। এখানে অবশ্য আরো একটি বিষয় কাজ করে, বিদেশের বেশিভাগ ছাত্রছাত্রী বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে আগ্রহী নয়। যে কারণে আমাদের এই ছাত্রছাত্রীদের কাজের বাজারটি সেখানে আছে। দেশের ভেতর যেকোনো ডিসিপ্লিনের যারা চাকরি করছে, তাদের ভেতর খুব কম একটি অংশ সরকারি চাকরি পাচ্ছে। সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা কম। শুধু একটু নিশ্চয়তা আছে। এই নিশ্চয়তাটুকুই দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য কত বড় বিষয়, তার দুটো প্রমাণের একটি হলো- শুধু সরকারি চাকরিতে ঢোকার জন্য কোটা আন্দোলনের মতো একটি বড় আন্দোলন করেছে এ দেশের ছেলেমেয়েরা। অনেকটা না বুঝেই তারা আন্দোলন করেছে। আর সে আন্দোলন করে এটাই মনে করে, হয়তো কোটা উঠে গেলে তারা একটু বেশি সুযোগ পাবে সরকারি চাকরিতে। কিন্তু সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা যা, সে তুলনায় বিদেশে গিয়ে অনেক সাধারণ মানের চাকরি করে ভালো থাকা যায় বলে মনে করে বেশিভাগ তরুণ-তরুণী।

অন্যদিকে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোতে চাকরি করতে হলে কমপক্ষে বারো ঘণ্টা চাকরি করতে হয়। কাজ অনেক বেশি। কাজের সিস্টেমও কম। অনেকে মনে করেন, সে তুলনায় কোনোমতে বিদেশে গিয়ে একটি চাকরি পেলে আট ঘণ্টা কাজ করে এর থেকে তিন গুণ বেশি বেতন পাওয়া যায়। তারপরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে হলে অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, কিন্তু এতটা ত্যাগ স্বীকার করার পরেও প্রতি মুহূর্তে একটি অনিশ্চয়তা কাজ করে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর খুব কম প্রতিষ্ঠানেই একটি সিস্টেম গড়ে উঠেছে। সিস্টেমকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই কম মূল্য দেয়। বরং সবখানে দেখা যায় প্রতিষ্ঠান এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিকতার বদলে অনেকটা গ্রাম্য মোড়লি কাজ করে, যা আধুনিক তরুণদের মানসিকতার সঙ্গে মোটেই যায় না। তা ছাড়া, তরুণরা আরো মনে করে এই সব প্রতিষ্ঠানের সিনিয়ররা সব সময়ই মালিক বা এক ব্যক্তিকে তোয়াজ করে চলেন। এবং তারা কখনোই তরুণদের মতামতের কোনো গুরুত্ব দেন না। এবং তরুণরাও খুব কম সিনিয়রের মধ্যে তাদের জন্য শিক্ষণীয় কোনো কথা পায়।

আরেক শ্রেণির আধুনিক তরুণ-তরুণী বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজ যেভাবে বেড়ে উঠছে, তাতে তারা অনেকখানি ভীত। তারা মনে করছে বর্তমানে দেশব্যাপী যে মৌলবাদ বাড়ছে, এর থেকে দেশকে বের করে আনার কোনো চেষ্টা নেই। কেবল শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্বের জোরে ও অনেক কিছু আপসের ফলে চলছে। শেখ হাসিনার অবর্তমানে তারা এ দেশের আধুনিক সমাজ বেড়ে ওঠার কোনো পথ দেখতে পাচ্ছে না। কোনো রাজনীতিই এমনকি শেখ হাসিনার দলও তার কোনো রূপরেখা দিতে পারছে না। তাই ভবিষ্যতের একটি মৌলবাদী সমাজে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক-স্বাধীনতা নিয়ে তারা শঙ্কিত। অনেকে শঙ্কিত তাদের নিরাপত্তা নিয়ে। এ কারণেও প্রগতিশীল একশ্রেণির তরুণ-তরুণী সব সময়ই দেশত্যাগের চেষ্টা করছে। আবার রয়েছে আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপত্তা। দেশে সরকারি চাকরিতে আর্থিক নিরাপত্তা খুব বেশি নয়। অন্যদিকে বেসরকারি চাকরিতে প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা। পাশাপাাশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসও খুব বেশি আপটুডেট করার দিকে কোনো মনোযোগ নেই। এমত অবস্থায় প্রতিটি তরুণ-তরুণী তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভালো শিক্ষা ও উন্নত জীবনের নিরাপত্তা দেখতে পায় বিদেশে। এবং যারা বিদেশে গেছে তাদের বড় একটি অংশ নিজেরা কষ্ট করলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে। তাই স্বাভাবিকই এ নিরাপত্তাও দেশত্যাগের একটি বড় কারণ।

সর্বোপরি ষাটের দশকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যেমন সরকারপ্রধান হিসেবে বিদেশে বসবাসরত ভারতীয়দের তাদের দেশে এসে অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে ভূমিকা রাখার জন্য বারবার আহ্বান জানাতেন; আমাদেরও মনে হয় সময় এসেছে সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন আহ্বান জানানোর। কারণ, এই ধারা চলতে থাকলে দেশ বাস্তবে দক্ষ জনশক্তির সংকটে পড়ে যাবে। যা দেশের জন্য সব থেকে বড় ক্ষতি। দেশে মেশিনের পেছনের মানুষ থেকে উদ্ভাবনী মানুষ- সবই যদি কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সেটাই দেশের সব থেকে বড় ক্ষতি। এ কারণে এখনই সজাগ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। যাতে তারা উন্নত বিশ্ব থেকে জ্ঞান নিয়ে এসে দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারে, সে পথ তাদের করে দিতেই হবে, দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে।

লেখক: শাকিবুল হাসান 
শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ রাজশাহী 






এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ





















© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
themesbazar_brekingnews1*5k