২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ ৬ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি



বঙ্গবন্ধুর অবদান বাংলার স্বাধীনতা

হামিদা আব্বাসী
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১

২৫ শে মার্চ কে কালো রাত্রি বলা হয়। কেননা এই রাত্রিতে অসংখ্য সাধারণ বাঙালি, বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং পরিচয় না জানা প্রায় ৫০ হাজার ঘুমন্ত বাঙালিদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তারা চেয়েছিল বাংলাদেশকে মানুষ, জ্ঞান ও মেধার দিক দিয়ে নির্মূল করে দিতে।কিন্তু এ কাজে যে তারা ব্যর্থ হয়েছে আজকে আমাদের বাংলার স্বাধীনতা তার প্রমাণ বহন করে।

আর স্বাধীন হবেই না কেন! যে জাতির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো আধ্যাত্নিক নেতা আছে, সে জাতি হেরে যেতে পারেনা।

বিশ্ব ইতিহাসের ঘৃণ্যতম ও তমসাচ্ছন্ন এক অধ্যায় ২৫ মার্চের মর্মান্তিক গণহত্যার দিনটি মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছর পর ২০১৭ সাল থেকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সেইসঙ্গে দিনটিকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের দাবিও অব্যাহত রয়েছে।

পঁচিশ মার্চের ভয়াল রাতে গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মেতে উঠেছিল বাঙালি নিধনযজ্ঞে। অন্যদিকে এই নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার বিরুদ্ধে অসম সাহসী বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।

পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার এ লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

                         লেখক

যদি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক না দিতেন, তখন কি হতো! বাঙালি কি স্বাধীন হওয়ার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তো! কোনো কিছু অর্জন করতে হলে সাহস, মনোবল ও উদ্দীপনা দরকার।

বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে যুদ্ধে লড়াই করার মনোবল ও সাহস পেয়েছিল। তিনি যখন ৭ ই মার্চে ভাষণ দিলেন সেই ভাষণ বাঙালি জাতি তাদের মননে গেঁথে নিয়েছিল।
তারপর তিঁনি যখন ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন বাঙালিরা আর থেমে থাকেনি। একটি ঘোষণা তাঁদেরকে স্বাধীনতার জন্য, পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য প্রাণপণে লড়াই করায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।

সেদিন ঘোষণা কি ছিল,আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এর মূল্যায়ন হয়েছিল কেমন কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম পাঠ করলেই বোধগম্য হবে।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের ঢাকার পরিস্থিতি ও শেখ মুজিবকে আটক ও স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের ঘটনা ২৭শে মার্চেই বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থার খবরে প্রকাশিত হয়।

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা: ফ্যাক্টস অ্যান্ড উইটনেস (আ.ফ.ম সাঈদ)’ বইতে স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে বিদেশী সংবাদপত্র ও সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টের একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে।

ওই সংকলন অনুযায়ী বিবিসির খবরে তখন বলা হয়েছে,

“…..কলকাতা থেকে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের খবরে প্রকাশ যে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এক গুপ্ত বেতার থেকে জনসাধারণের কাছে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।…”

ভয়েস অব আমেরিকার খবরে বলা হয়েছিলো:

“….ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। মুজিবুর রহমান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং সারা বিশ্বের নিকট সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন…”।

দিল্লির দি স্টেটসম্যানের খবর ছিলো:

“বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে রহমানের পদক্ষেপ। একটি গোপন বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের পূর্বাংশকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে নতুন নামকরণ করেছেন।”

দি ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন: ২৭শে মার্চ দি ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ‘সিভিল ওয়ার ফ্লেয়ারস ইন ইস্ট পাকিস্তান: শেখ এ ট্রেইটর, সেইস প্রেসিডেন্ট’শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন ঘোষণা ও ইয়াহিয়া খান তার বেতার ভাষণে শেখ মুজিবকে বিশ্বাসঘাতক বলার কথা উল্লেখ করা হয়।

দি গার্ডিয়ান: গার্ডিয়ানের ২৭শে মার্চ সংখ্যায় এক খবরে বলা হয়,

“…২৬শে মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে রেডিওতে ভাষণ দেয়ার পরপরই দি ভয়েস অব বাংলাদেশ নামে একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর এই ঘোষণা অপর এক ব্যক্তি পাঠ করেন।”

এর বাইরে ভারতের বহু সংবাদপত্র এবং আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ক্যানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, হংকং, নরওয়ে, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশের খবরে স্থান পায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর।

আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ারস হেরাল্ডের ২৭শে মার্চের সংখ্যার একটি খবরের শিরোনাম ছিলো, “বেঙ্গলি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডিক্লেয়ার্ড বাই মুজিব।”

৭ই মার্চের এই ভাষণের পরই বোঝা যাচ্ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি কোন দিকে এগুচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমসেও শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়ার ছবি ছাপানো হয়েছিলো। পাশেই বলা হয়েছে ‘স্বাধীনতা ঘোষণার পর শেখ মুজিব আটক’

বার্তা সংস্থা এপির একটি খবরে বলা হয়,

“ইয়াহিয়া খান পুনরায় মার্শাল ল দেয়া ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।”

আয়ারল্যান্ডের দি আইরিশ টাইমসের শিরোনাম ছিলো – পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা আর সাথে ছিলো শেখ মুজিবের ছবি।

দিল্লি থেকে রয়টার্সের খবরে ১০ হাজার মানুষের নিহত হবার ও স্বাধীনতা ঘোষণার পর মুজিবকে সম্ভবত আটক করা হয়েছে, এমন কথা বলা হয়।

ব্যাংকক পোস্টের খবরে বলা হয়,

“শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নাম দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”

উপরিউক্ত সংবাদমাধ্যমের পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরেই।

তারপর বাকিটা সবার জানা, বাঙালিরা টানা নয় মাস যুদ্ধের মধ্যদিয়ে দিন অতিবাহিত করে ১৬ ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করে।বাঙালি জাতির পিতা স্বাধীনতার ঘোষক স্বসম্মানে স্বশরীরে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। আজো বাঙালিরা এই দিনটিকে’স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’হিসেবে উদযাপন করে।

নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার পেছনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অসামান্য ও অতুলনীয় ছিল। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এই মহান ব্যক্তিকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাসহকারে।তিনি আজীবন দেশ ও জাতির কাছে অতুলনীয় হয়ে থাকবেন।

লেখিকা: হামিদা আব্বাসী
শিক্ষার্থী, বিবিএ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।






এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ





















© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
themesbazar_brekingnews1*5k