৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১৫ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি



শশুর বাড়ির ইফতারি নামক সামাজিক কুসংস্কার বয়কট করুন

আলিম রাজ
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১

আমাদের সমাজে রয়েছে এমন কিছু কুসংস্কার যা একটা মেয়ের বাবাকে তিল তিল করে মৃত্যু পথযাত্রীর দিকে ঠেনে নেয়। আমরা একটি নোংরা সংস্কৃতির সমাজে বসবাস করছি, যে সমাজে আমরা মুখে বলি যৌতুক একটি অপরাধ, কিন্তু যৌতুকের চেয়ে বেশি অর্থ অপচয় করতে হচ্ছে একটা মেয়ের বাবাকে। বিয়ের সময় ৩/৪ লক্ষ টাকার ফার্নিচার ১ লক্ষ টাকার মত রুমের আসবাব পত্র। বিয়ের খানা খরচ ২ লক্ষাধিক,বিয়ের পর মেয়ের শশুর বাড়ির চৌদ্দগোষ্টিকে দাওয়াত খাওয়ানোর সঙ্গে চৌদ্দগৌষ্টির জন্য কাপড় দেয়া।এমন কতগুলো কুসংস্কার আমাদের সমাজে চলমান,এর মধ্যে ইফতারি নামের এক কু-প্রথা অন্যতম।
“শ্বশুরবাড়ীর ইফতারি সামাজিক বন্ধন নয়, বরং সামাজিকতার নামে একটা মেয়ের বাবার উপর এক নিরব অবিচার”যা যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়ে আসছে।শুধুমাত্র অবিচারই নয় একটা প্রচলিত কুসংস্কারও বটে। তারই ধারাবাহিকতায় যুগ যুগ ধরে এই নীরব অবিচারের বলি হচ্ছেন মেয়ে পক্ষ বা মেয়ের বাবা অথবা তার পরিবার। একমাত্র ভুক্তভোগী পরিবার জানে এই কুসংস্কারের বলি হয়ে তারা কতটা জর্জরিত। জন্মের পর থেকে একটা মেয়ে পরিপূর্ণভাবে তার পরিবারের উপর নির্ভরশীল। বিয়ের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তার যাবতীয় খরচ তার পরিবারই বহন করে তাকে। ১৮-২০ টা বছর ভরন-পোষণ করে কোনরূপ প্রতিদান না নিয়েই একজন বাবা তার মেয়েকে পাত্রস্থ করে দেন। সেই বিয়েতে মেয়ের বাবাকে/অভিভাবককে জামাই বাড়ির কতরকম আবদার নীরবে সহ্য করে মেটাতে হয়। আর শুধুই কি এখানেই শেষ? একটা মেয়ের বিবাহ সম্পন্নের পর আরো কত যুগ শশুরবাড়ির কত রকমের আবদার মেটাতে হয়, তার কোন সীমারেখা নেই।
বিয়ের সময় ছেলে পক্ষকে ধুমধাম করে খাওয়াতে হবে তা যেন বাধ্যতামূলক।সাথে ভালো ফার্নিচার ও দিতে হবে। ফার্নিচার বলতে রান্নাঘরের থালা-বাসন থেকে শুরু করে সোফা,ফ্রিজ, আলমারি,পালং,চেয়ার-টেবিল,ড্রেসিং টেবিল, বেড আরও অনেক কিছু।এক কথায় একটি  ঘর সাজানোর জন্য যা যা লাগে সেই সব কিছু যেন ছেলের বিয়েতেই শশুর বাড়ি থেকে আদায় করতে চায় বরপক্ষ। আর এতে আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জিত হতে চাইনা,বরং মনে করি এটা আমাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে।
আর তাই বিয়ে করে শশুরের কাঁধে চড়ে সভ্যতার যাত্রা শুরু করতে চায়। সাধ্য অনুযায়ী বরপক্ষের এসব আবদার মিটিয়ে দিয়েই বিয়ে হয়ে যায়। তাহলে কি বিয়ে হয়ে গেলেই মেয়েপক্ষ স্বস্তির নিঃস্বাস নিতে পারছে?মোটেই নাহ! বরং বিয়ের প্রাথমিক ধাপ শেষ করে স্ব-জ্ঞানে বাকি জীবন সিজনভিত্তিক অবিচার মেয়ে পক্ষকে সহ্য করে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।আর সেই বন্দোবস্ত অনুযায়ী আপনাকে চলতেই হবে। আপনার বিভিন্ন উপঢৌকন নির্ভর করবে আপনার মেয়ে সুখে থাকবে নাকি দুঃখে থাকবে। মেয়ের সুখের জন্য মেয়ের অভিভাবকরা দিনের পর দিন শশুর বাড়ির এইসব জুলুম নিরবে সহ্য করেই যায় আর এখন আধুনিক সমাজেও তা সহ্য করতে হচ্ছে।
ইফতারি,নাইওরী,আম কাঠালি মেয়ের বাবার বা পরিবারের বুকে সভ্য সমাজে অসভ্যতার এক ভয়াল তীর।আমরা আধুনিক আর সভ্যতার স্লোগান দিচ্ছি তবে মেয়ের বাবার প্রতি এই অবিচার কেন?
রমজান মাস আর সিজনভিত্তিক নাইওরীর সময় হলে বাবার বা পরিবারের চিন্তা বাড়তেই থাকে। মেয়েকে/বোনকে কিভাবে ইফতারি দেবে, কিভাবে ইফতারি/আম কাঠালী দেবে? ভালো করে ইফতারি /আম কাঠালী না দিলে মেয়েকে শশুরবাড়ি আর আশেপাশের মানুষের কটুকথা আর কতপ্রকার অসামাজিক অত্যাচার নীরবে সহ্য করতে হবে।এক রমজান মাসেই তিনবার ইফতারি আসা চাই। তাও আবার যেমন তেমন ইফতারি না।
আশপাশ যেভাবে জানে সেইভাবে আনতে হবে। গর্ব করে যাতে আশেপাশের মানুষকে বলতে পারা যায় এমন করে আনতে হবে। একটু কম হলেই মেয়ের কপালে কটু কথা আর কালবৈশাখির ঝড় রীতিমতো অনিবার্য। এমন কি উদাহরণ দিয়ে বলতে থাকেন অনেকেই,অমুকের ছেলের বউর ঘরভর্তি ইফতারি এসেছে। সারাটা গ্রাম বিলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি আমার আত্নীয়দেরকেই দিতে পারিনি।লজ্জায় আমি মুখ দেখাতেই পারছিনা।এরকম নানান কথা কোন কোন পরিবারের ছেলের বউকে শুনতে হয় প্রতিনিয়ত।
কিন্তু কেন এই অসভ্যতা আর অবিচার?প্রশ্ন সচেতন মহলের। প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও তা পরিহার হচ্ছেনা এটাই সত্য।
এইসব ইফতারি কয়টা পরিবার স্বানন্দে তার মেয়ের বাড়ি দিয়ে থাকে,হাতেগুনা কয়েকটা পরিবার পরে শুধুমাত্র মেয়ের/বোনের মুখ রক্ষার্থে সামাজিক এই কুপ্রথার ভার অনেকগুলো পরিবার অনাহাসে বয়ে যাচ্ছে। কোনোরূপ আনন্দ ছাড়াই মেয়ে পক্ষ বলিদান হয়ে যাচ্ছে।সবচাইতে বেশী নির্মমতার স্বীকার সমাজের দারিদ্র্য ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। দারিদ্র্য পরিবারগুলো মেয়ের সুখের জন্য সুদে টাকা এনে হলেও মেয়ের বাড়ি ইফতারি দিতে হয়,বাধ্য।শশুর বাড়ী যখন ইফতারি খাওয়া আর বিতরণে ব্যস্ত,হয়তো সেই রাতে একটা মেয়ের বাবা চোখেরজলে বালিশ ভিজাচ্ছে।কিভাবে সে টাকা পরিশোধ করবে।সেই টাকার চিন্তা শেষ হতে না হতেই দেখা যায় আরেকটা আম-কাঠালী দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। উফফফ,কি নির্মমতা!এতে অনেকে গৃহহারাও হচ্ছেন বলে দেখা যাচ্ছে সচরাচর।অনেকেই মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ইফতারি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও ইতিহাস সাক্ষি দিচ্ছে৷ব্যর্থ হয়ে কি আর ঘটনা এখানেই শেষ? মোটেও না! এই ব্যর্থতার প্রতিদান আত্মহত্যার মাধ্যমে দিতে হয়েছে কতশত তরুণিকে।সাধ্য নেই তবুও মেয়ের বাড়ি ভালো করে ইফতারি দিতে হবে,না হলে কত লোকলজ্জা তাদের আর তাদের মেয়ের কপালে থাকবে অজানা কতশত ঝড়।
শুধু কি ইফতারি দিয়েই মেয়েপক্ষ রেহাই পেয়ে যাচ্ছে।নাহ! রমজান পরেই শুরু হয় সিজন ভিত্তিক বিভিন্ন নাইওরীর পালা। একটার পর একটা নাইওরী চলতেই আছে। আম কাঁঠাল নাইওরী,শীতকালীন পিঠা নাইওরী আরও অনেক কিছু। বিভিন্ন বিশেষ দিনে আরও কত কিছু ছেলের বাড়ি পাঠাতে হয়।
হায় এ কেমন অভিচার? আপনি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন নাকি আপনার চৌদ্দগুষ্ঠীর খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব মেয়ের বাড়ির সাথে বন্দোবস্ত করেছেন? সমাজের কিছু কিছু বিত্তবান মানুষের বিলাসিতা বাকি হাজারটা পরিবারের সুখ কেড়ে নিচ্ছে। তাদের একেকটা বিলাসি কর্মকাণ্ড পরবর্তী হাজার পরিবারের নির্মমতার কারণ হচ্ছে। অনেকে বলে থাকেন এসব ইফতারি নাইওরী দিলে সামাজিক সম্পর্ক বাড়ে,পারস্পরিক মায়া মমতা বাড়ে। সারা জীবন খেয়েই যাচ্ছেন। এতে সম্পর্ক বৃদ্বি হচ্ছেনা।বরং এই দেওয়ার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে হাজার হাজার অশ্রু আর মেয়ের জামাই বাড়ির প্রতি নিরব ঘৃণা। যা মুখ ফুটে বলা হচ্ছেনা।
আসুন, আপনার সিজনভিত্তিক একদিনের নাইওরী আর ইফতারি খাওয়ার আনন্দ করে অন্য পরিবারের সারাটা মাস বছরের চিন্তার কারণ না হই। আপনি মেয়ে কে নিয়ে সুখে থাকুন,আর মেয়ের পরিবারকে এই সামাজিক অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়ে একটু শান্তিতে থাকতে দিন। একটা বাবার মেয়েকে নিজের মেয়ে ভাবুন। একবার চিন্তা করুন অন্তত এই বাবার এসব দেওয়ার সামর্থ্য কি আছে? নাকি আমাদের সমাজের চলতি কু-প্রথার স্বীকার হয়ে বাধ্য হয়ে দিচ্ছে।অনেকেই এটা আমাদের সভ্যতা বলেও মনে করেন,কিন্তু আসলেই আমাদের সমাজের এটা কোন সভ্যতা না। বরং এটা সভ্য সমাজের জন্য একপ্রকার অসভ্যতা। আর ইসলামেও এব্যাপারে বাধ্যতামূলক কিছু বলা হয়নি যে ইফতারি দিতেই হবে।
সুতরাং আসুন এই ইফতারি নামক কু-প্রথা পরিহার করি। সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই ইফতারি নামক কু-প্রথার কারনে কোন বোন কটুকথা শুনবেনা,আর কোন বাবা নিরবে অত্যাচারিত না হবে। আসুন আপনি/আমি সবাই মিলে সুন্দর সমাজ গঠনে এগিয়ে আসি।






এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ





















© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
themesbazar_brekingnews1*5k