১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২১শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি



সমাজে আত্মহত্যার দৌরাত্ম্য ও আমাদের করণীয়

শাকিবুল হাসান
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৫ মার্চ, ২০২১

মানুষ সর্বাপেক্ষা আবেগী জীব। পৃথিবীর আর কোনো প্রাণি প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বা প্রেমিকের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা করে এ রকম উদাহরণ নেই। মানুষই একমাত্র প্রাণী যে কিনা সাময়িক সঙ্গীর বিরহ শোকে বিলাপ করে বা আত্মহত্যা করে মুক্তি খোঁজার চেষ্টা করে। আত্মহত্যায় আসলেই কি মুক্তি পাওয়া যায়? একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে কি করে পারে কপট প্রেমিকের প্রেমে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা করতে? পৃথিবীর উন্নত দেশে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মেয়েরা কি পরিমাণ আত্মহত্যা করে সেই পরিসংখ্যান আমার অজানা। তবে অনুমান করতে পারি, বাংলাদেশে এই হার অত্যন্ত ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক। তাছাড়া ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি

মানুষ প্রেমে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। প্রেমিকের সাথে বনিবনা না হওয়া সেটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রেমে ব্যর্থ হলেই আত্মহত্যা বা জীবনকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার মতো বিকৃত ও নিন্দিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এর কোনো মানে নেই। WHO (World health Organisation) -এর পরিসংখ্যান দেখলে চোখ কপালে উঠে যায়। WHO পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাবিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৮ লক্ষ্য মানুষ অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪০জন মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা বিশ্বে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারন হলেও যে কোনো বয়সেই আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটতে পারে। ৭৯% আত্মহত্যাই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে দেখা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে মানুষ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে তার মধ্যে বারবার সেই প্রবণতা দেখা যায়। সবথেকে বেশি আত্মহত্যা ফাঁসি ও কীটনাশক পানের মাধ্যমে হয়ে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আত্মহত্যার নিরিখে শীর্ষে রয়েছে লিথুলিয়া তারপর লিষ্টে রয়েছে রাশিয়া , জাপানের মতো উন্নত দেশ । বিশ্বের মধ্যে আন্তেগুয়া ও বারবুড়ায় সবচেয়ে কম সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন।

আত্মহত্যা বা নির্যাতনের ক্ষেত্রে মেয়েরাও অনেক ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ। তাদের মধ্যে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। কারণ তারা একটি ছেলের মন-মানসিকতা, অসৎ উদ্দেশ্য খেয়াল না করেই শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে তার সাথে প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত হয়ে বা বিয়ের মিথ্যা আশ্বাসের ফাঁদে পড়ে খুব সহজেই নিজেকে পরপুরুষের হাতে শপে দেয় বা তার সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেটা মিথ্যা প্রমাণিত হলে যে নিজেকে নির্যাতিতা বলে আত্মপ্রকাশ করে এবং অনেক সময় সমাজের চক্ষু লজ্জায় আর বাবা মায়ের সম্মানের কথা ভেবে আত্মহত্যা করতে উদ্যোত হয়।
প্রেম কখনোই জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়। বিবাহের মতো স্বীকৃত ব্যাপারই যখন নানামুখী জটিলতায় ভেঙে খান খান হয়ে যায়, সেখানে প্রেমের মতো অস্বীকৃত আবেগের কি’বা মূল্য থাকতে পারে? সব মানুষ প্রেমের মূল্য বোঝে না, তাই না জেনে সব মানুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোরও কোনো মানে হয় না। অনেকদিন এক সঙ্গে চলার পরও যখন কোনো মানুষ প্রতারণা করে নিছক স্বার্থে মুগ্ধ হয়ে দূরে সরে যায়, তার জন্য আত্মঘাতী হওয়া কতটা বোকামি আর হাস্যকর সেটা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখলে কোনো মেয়ে আত্মহনন করতো না। জীবনে কোনো ঘটনাই চিরস্থায়ী হয় না। প্রেমও তেমনি এক অস্থায়ী ঘটনা। মানুষের জীবনে প্রেম আসে, প্রেম চলে যায়—প্রবহমান প্রেমের জন্য যে মানুষ জীবন বিসর্জনের মতো ঘৃণ্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার মরে যাওয়াই উত্তম। কেননা সে যদি বেঁচে থাকে— তাহলে কেবল নিজেকেই শাস্তি দেয় না, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকেও যথেষ্ট ভোগান্তির মধ্যে ফেলে।
যেই মেয়ে মনে করে প্রেমের সম্পর্ক তার কাছে জীবনের চেয়েও মূল্যবান, যেই মেয়ে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলে সে বাঁচবে না— তার উচিত ছিল এমন কাউকে ভালোবাসা যে, তার প্রেমের মূল্য বুঝবে ও তার প্রেমকে সম্মান করবে। সবকিছু নিয়ে কৌতুক করা যেতে পারে কিন্তু জীবনের প্রশ্নে অবশ্যই বিচক্ষণ হতে হবে।

পরিবারের কোনো মেয়ে যখন অপমৃত্যুর শিকার হয় তখন সামাজিকভাবে ওই পরিবার কতটা হেয় হয়ে যায়, কোনোদিনও আত্মহত্যাকারী মেয়ে তা বুঝতে পারে না। সে তা বোঝার চেষ্টাও করে না।
সাধক কবি লালন শাহ বলেছেন—‘সুজন দেখে করো পিরিত শেষ ভালো দাঁড়ায় যাতে/না জেনে মজো না পিরিতে।’ সম্পর্ক করার আগে চিন্তা করে দেখুন কার সঙ্গে সম্পর্ক করছেন। এমন কাউকে জীবনে জড়াবেন না, যে আপনার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্টি কপালকুণ্ডলা বলেছিলেন ‘এ জীবন লইয়া আমি কী করিব’? আমি বলি জীবন নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। জীবন অত মূল্যহীন নয়। হত্যা কিংবা আত্মহত্যা নয়, আমরা জীবনকে ভালোবাসবো। জীবনে কে এলো, কে চলে গেলো এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী!

আমরা সবাই জানি এ জগত দুঃখময় তবে দুঃখের কারন আছে আবার দুঃখ নিবারনের জন্য উপায়ও আছে এটা আমরা ভুলে যাই । অনেকে সামান্য ব্যাপারে কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় , তারা ভুলে যায় একটা জীবন তৈরি হতে কত সময় লাগে , আর তার জন্য সুন্দর একটা সময় অপেক্ষা করছে । হয়তো যে সমস্যার জন্য সে আত্মহত্যা করছে তার পরবর্তীকালে তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। কেননা কোন দুঃখ বা সমস্যাই চিরন্তন নয় তা একদিন মিটে যাবেই। কিন্তু জীবন চলে গেলে আর জীবনকে ফিরে পাওয়া যাবে না। সুতরাং আত্মহত্যার মতো জঘন্যতম কাজ থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। এজন্য আমাদের মানসিকতার যথেষ্ট পরিবর্তন করা দরকার। সমাজে বা পাড়া-মহল্লায় কারো দোষ-ত্রুটি দেখলে সেটা নিয়ে সমালোচনা করার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। আর যেহেতু প্রেম-ভালোবাসা গোটা জীবনের সাথে জড়িত তাই জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।

লেখক: শাকিবুল হাসান

শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ রাজশাহী






এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ





















© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
themesbazar_brekingnews1*5k