১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২১শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি



সারা দেশে মশকনিধন: চাই পরিকল্পিত কর্মসূচি

সম্পাদকীয়
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৪ আগস্ট, ২০২১

মশার ভনভনানির মধ্যে ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস পালিত হলো। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলো, শূন্য ম্যালেরিয়া লক্ষ্যে পৌঁছানো’। ব্রিটিশ চিকিৎসক স্যার রোনাল্ড রস ১৮৯৭ সালে অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া রোগ হয় আবিষ্কার করেন। তার স্মরণে প্রতি বছর ২০ আগস্ট মশা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। অ্যানোফিলিস মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়ায় বিশ্বে ২১৯ মিলিয়ন মানুষ সংক্রমিত হয়। বছরে ম্যালিরিয়ায় চার লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। তাদের মধ্যে বেশি মারা যায় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, বিশ্বের অর্ধেক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বছরের ১০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে এক সময় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি ছিলো। এখন তা অনেকটা কমেছে। তবে দেশের ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়াপ্রবণ।

এগুলোর মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি জেলায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মশাবাহিত ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়। ফলে এ তিন পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর ৯০ শতাংশ দেখা যায়। পাহাড়ি উঁচু এলাকা, বন জঙ্গল ও বৃষ্টিস্নাত পরিবেশের কারণে অ্যানোফিলিস মশা জন্মের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। দেশের ম্যালেরিয়া আক্রান্তদের ৭৬ শতাংশই বান্দরবানে। অন্যদিকে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ওই বছর সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখের বেশি মানুষ। সরকারি হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন ১৭৯ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে বলছে অন্য কথা। তাদের হিসেবে ৩০০ জনের বেশি মারা যায়। চলতি বছর গত ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন সাত হাজার ২৫১ জন মারা গেছেন ৩১ জন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এভাবে ডেঙ্গু বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২৩ প্রজাতির মশা চিহ্নিত হয়েছে।

কীটতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এগুলোর মধ্যে ১৪ প্রজাতির মশা ঢাকায় আছে। তবে দেশে কিউফেক্স মশা সবচেয়ে বেশি। ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ ছড়ানো এ মশার প্রকোপ বাড়ে শীতকালে বেশি। এ ছাড়া এডিসের দুটি প্রজাতি ডেঙ্গু ছাড়ায়। বাংলাদেশে ডেঙ্গু বিস্তারে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভূমিকা রাখে গৃহপালিত ও নগরকেন্দ্রিক এডিস ইজিপ্টি মশা। ডেঙ্গু বিস্তারে ৫ থেকে ১০ শাতংশ ভূমিকা রাখে এডিস এলবোপিকটাস যাকে বলে এশিয়ান টাইগার মশা। দেশের প্রতিটি গ্রামে এ মশা রয়েছে। এডিসের কামড়ে চিকুন গুনিয়াও হয়। অন্য প্রজাতির যেসব মশা আছে, তা কিউলেক্স বা এডিসের মতো সংখ্যায় বেশি নয়।

দেশের নগরগুলোয় এ মশা দুটির ছড়াছড়ি। কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভালো কোনো পদ্ধতি না থাকা। এ ছাড়া অপরিচ্ছন্নতাও মশা বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ।

মশাবাহিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, জিকা ভাইরাস অন্যতম। এ জন্য মশার বংশ ধ্বংস করে মানুষ বাঁচানোর কথা সবাই বললেও মশার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ এখানে খরচ করা হচ্ছে বিশাল অংকের অর্থ। গত অর্থবছরে দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশনে মশকনিধনে ব্যয় হয়েছে ১১৩ কোটি টাকা। কিটনাশক এবং তা ছিটানোর যন্ত্র কেনায় এ টাকা খরচ হয়েছে।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯টি সিটি কর্পোরেশনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪১ কোটি টাকা। কিন্তু রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে কি এসব সিটি কর্পোরেশন এলাকা থেকে সব ধরনের মশা নির্বাসিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মশা নিয়ে গবেষণা করতে হবে। কোন ওষুধে কোন মশা মরে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। মশার প্রকারভেদে ও আচরণ ভেদে ব্যবস্থা ভিন্ন হতেও পারে। তাছাড়া নাগরিক জীবনে সচেতনতা বাড়াতে হবে। নিজ নিজ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রেখে মশার বংশ বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করতে হবে।

মশার জীবনচক্র এমন যে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে চড়ে জেলায় জেলায় ঘোরে এবং বিমানে চড়ে বিশ্ব ভ্রমণ করে। অপরিকল্পিতভাবে শুধু মশার ওষুধ ছিটালে কোনো ফল পাওয়া যায় না, তা তো আমরা প্রতি বছর দেখছি। তাই মশা দিবসের প্রত্যয় হোক, পরিকল্পিতভাবে করবো মশার বংশ ধ্বংস। এ জন্য যদি পৃথক গবেষণা সেল গঠন করার প্রয়োজন হয়, তাও করতে হবে নাগরিকদের মশাবাহিত রোগ থেকে বাঁচাতে। শুধু রোগে আক্রান্ত হলে তোড়জোর না করে বরং সারা বছর মশকনিধন কর্মসূচি চালাতে হবে। তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যেতে পারে।






এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ





















© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
themesbazar_brekingnews1*5k