১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২১শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি



স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও অর্থনৈতিক মুক্তি

রিপোটারের নাম
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২০ মার্চ, ২০২১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে অর্থনৈতিক মুক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ। কেননা স্বাধীনতা অর্জনের কর্মধারা এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন হলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে দেশের ও মানুষের আর্থ–সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। এ দুটির সুসমন্বয়ই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলে।  জনগণও এর সুফল ভোগ করে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। বস্তুত অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া কোনো দেশ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারে না। কারণ অর্থনৈতিই সমাজের মূল ভিত্তি। অর্থনৈতিক পরিবর্তন কেবল মানুষের আর্থ–সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, সামগ্রিক চিন্তা–চেতনা ও কর্মপ্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলে। যে কারণে স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়ে যায় অর্থনৈতিক মুক্তির যুদ্ধ।

বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, অত্যাচার ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়ে দারিদ্র্য কশাঘাতে জর্জরিত হয়েছে। সারাদিন আধাপেট খাওয়া না–খাওয়া এদেশের অধিকাংশ ভগ্ন–জীর্ণ স্বাস্থ্যের মানুষকে রাজনৈতিক দলগুলো শুনিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলোর দুরবস্থা দেখে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। এ হীন অবস্থার জন্য দায়ী নব্য উপনিবেশবাদী পাকিস্তান। কারণ এ দেশ তখন ছিল পাকিস্তানের পূর্বাংশ।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘ ২৪ বছর বাংলাকে অর্থনৈতিক দিক থেকে বঞ্চিত ও পঙ্গু করে রেখেছিল। আমাদের অর্থসম্পদ লুট করে বাজেটের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করে নিজেদের উন্নতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছিল।

বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যে বোধ বা চেতনাকে কেন্দ্র করে ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল, সেটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এ চেতনার মূল লক্ষ্য ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।  যে সমাজে মানুষ পাবে তার মৌলিক অধিকার, অর্জিত হবে অর্থনৈতিক মুক্তি। এদেশের মানুষ কাজের সুযোগ পাবে, তিনবেলা খাবার পাবে, শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। এ দেশের মানুষের উপার্জিত অর্থ এ দেশের উন্নয়নেই ব্যয় হবে।

অর্থনৈতিক মুক্তির কথাটা মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় প্রোথিত ছিল। স্বাধীন দেশে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা জীবনপণ যুদ্ধ করেছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা অহরহ উচ্চারিত হচ্ছে, কিন্তু স্বাষীনাতর ৫০ বছরে এসেও কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতি পৌঁছাতে পারেনি।

দীর্ঘকালের শোষণ-বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের বিষয়টি বাংলার মানুষ অবহিত হলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি ও ষড়যন্ত্রের আচঁ পেয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৬ শে মার্চ, ১৯৭১ –এ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দৃঢ় প্রত্যয়ে উজ্জীবিত হয়ে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে এদেশের আপামর মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব। বন্ধু দেশের সাহায্য– সহযোগিতায় পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়। বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্জীবনের আন্তরিক প্রয়াস চলতে থাকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে এদেশের অর্থনীতি আজও আশানুরূপ বিকশিত হতে পারেনি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ যে সোনার বাংলার স্বপ্ন লালন করেছিল জাতি, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহীনতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, দূর্বল অবকাঠামো, পুঁজির স্বল্পতা ইত্যাদি নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবণতার কারণে বাংলাদেশ আজও দারিদ্রপীড়িত। নানা দূর্নীতি সর্বস্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে দেশের অর্থনীতিকে ঝাঁঝর করে দিচ্ছে। যে কারণে আশানুরূপ উন্নয়ন প্রবলভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকারি নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, একাধিকবার শামরিক শাসন, রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা, জাতীয় জীবনে সমন্বিত প্রতিশ্রুতির অভাব ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমাদের দেশের মানুষের বিলাসী ও আয়েশি মনমানসিকতার কারণে দূর্নীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।  সম্পদের সুষম বণ্টন, সম্পদ ব্যবহারে অদক্ষতা, বিপুল অদক্ষ জনশক্তি ও দূর্বল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোও আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্তরায়। এসব অন্তরায় উত্তরণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করে শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যাতে দুঃখী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়৷ কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাধীনতা যেমন অর্থবহ হয়ে ওঠেনি তেমনি দারিদ্রপীড়িত অগণিত মানুষের অভাব, কষ্ট, ব্যর্থতা ও হতাশা ঘোচেনি। কারণ স্বাধীনতার সুফলগুলো সব মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদী ও গনবিরোধী  চক্রের মুঠোয় চলে গেছে। সেই গণতন্ত্র আজ ৫০ বছরেও এসেছেও প্রশ্নবিদ্ধ। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের স্বার্থেই দৃঢ় হাতে দুষ্টচক্রকে দমন করে এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বাস্তবায়িত লক্ষ–কোটি বাঙালির স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

লেখক: শাকিবুল হাসান 

শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ রাজশাহী 

সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

 






এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ





















© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
themesbazar_brekingnews1*5k